উদ্ধারণপুরের ঘাট

Abadhut
‘উদ্ধারণপুরের ঘাট’ ইন্টারনেট দুনিয়াতেই বইটির পিডিএফ কপি মিলবে। ডাউনলোড করে নিন। হাতের এনড্রয়েড মোবাইল ফোনে, ট্যাবে অথবা কম্পিউটার, ল্যাপটপের স্ক্রীণেই পড়ে ফেলুন। কাজে যাবার পথে, বাড়ী ফেরার পথে, শহরের যানজটে বসে। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে। বইটির প্রিন্ট কপি কোন প্রকাশনী থেকে বর্তমানে প্রকাশিত হয় কিনা আমাদের জানা নেই। তবে এটুকু আমাদের জানতে-বুঝতে বাকী নেই এমন কথককে কেন লুকিয়ে রাখা হয় বাংলা সাহিত্যের আলোচনায়। 

‘অবধূত অশ্লীল। খুবই অশ্লীল। তার বই না পড়াই ভালো।’ এমন যে কোন প্রচারণা এবং নিন্দাকারীকে এড়িয়ে চলুন, না হয় তার ন্যাংটি খুলে দিন। অবধূত পাঠে মন দিন। তন্ত্রসাধক কালিকানন্দ অবধূত, তাঁর উপন্যাস উদ্ধারণপুরের ঘাট, বইটি নিজে পড়ুন, অন্যকেও পড়তে বলুন। এই উপন্যাস পাঠ জরুরী। কেন জরুরী পাঠেই পাঠক উপলদ্ধি করতে পারবেন। আমরা আর বাড়তি কথা না বাড়াই।

তবে এটুকু মনে রাখুন, যারা নোংরা মন নিয়ে চলে, অবধূতেও তারা নোংরামি আবিষ্কারের চেষ্টা করবে। এই সত্য জানলে বোঝা যায়- সমাজে একদল লোক আছে যারা সত্যকে গায়েব করে দেয়, আরেকদল সত্য-মিথ্যার মিশেল ঘটায় সত্যকে নির্বাসনে পাঠাতে। এমন মানসিকতা থেকেই সমাজে কখন কখন কোন ব্যক্তির গায়ে যৌনগুজব লেপে দেয়া হয়। এভাবে ব্যক্তির মন ও মর্যদাকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়, লেখককে বেলায়ও তাকে লেখালেখি থেকে নিষ্ক্রিয় করতে অযৌক্তিক সমালোচনার বাণ নিক্ষেপ করা হয়। এর মানে এই নয়, যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করতে নোংরামি করে না কেউ। এমনটা বলা হচ্ছে না। বরং সমাজে এর হারই বেশী।

তন্ত্র সাধনা, তান্ত্রিক নিয়েও এমন সত্যমিথ্যা ছড়ানো আছে। যেন তান্ত্রিক মানেই ‘অপ’ কিছু। মন্দ উদ্দেশ্যে খাটানো জাদুটোনাবাজ। তান্ত্রিক মানেই যেন যৌনকাতর ব্যক্তি! দেহসাধনা মানেই হল স্থুল-যৌনতার গল্প। এমন অতি জানেওয়ালা মানুষের কাটতি নেই এই সমাজে। অধ্যত্ম সত্যকে জানার দরকার নেই তাদের, আসলে তারা থাকেই যৌনলিপ্সায়, নয়ত যৌন হতাশায়। মনের এই মর্ম দোষে অশ্লীলতা খুঁজতেও তাদের ক্লান্তি নেই।

আবার এও সত্য, একদল লোক আছে যারা অবধূত পাঠে যৌনটোপ খুঁজবে। চটি পাঠের আনন্দ নিতে চাইবে। উপন্যাসে নিতাই দাসীর রূপ বর্ণনায় তারা ওই আনন্দই নেবে। লেখকের ভাষ্যে নিতাইকে দেখে তার কাঁচামাংসের শিল্পকলা গ্রাস করতে শকুনচোখ নিয়ে যারা তাকিয়েছিল তারা পাঠক হিসেবেও উপস্থিত হবে। …যত মড়া উদ্ধারণপুরের ঘাটেই এসে ভীড় করে।

দুই.
‘উদ্ধারণপুরের ঘাট। ঘাটের কিনারায় মাথা ঠুকছে গঙ্গা।’ সে ঘাটের কাছেই শ্মশান। সেখানে আছে শবপরিত্যক্ত বিচিত্র শয্যার এক বিশাল গদি। তার উপর আসীন জটাধারী সাঁইবাবা। বোষ্টুমী নিতাই দাসীর কাছে যিনি গোসাঁই।নিতাই তাঁকে বার বার বলে ওই শ্মশান ছেড়ে তার সঙ্গে চলে যেতে। সে আহ্বানে সাড়া না দিয়ে গোসাঁই শ্মশানেই বসে থাকে।

গোসাঁইর চোখে নিতাই দাসীর রূপ বর্ণনাঃ
দুধে-আলতায় গোলা রঙের নিটোল নিখুঁত শিল্পকলা, কাঁচা মাংসের অপরূপ ভাস্কর্য। মানুষের দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করবার জন্যে দুধের মত সাদা সামান্য অাবরণ দিয়ে ঢাকা থাকে। গলাবন্ধ কাঁধ-কাটা শেমিজ আর সাদা থান, ও আবরণে কিছুই আবৃত হয় না। প্রতিটি রেখা আরও তীক্ষ্ন আরও প্রখর হয়ে উঠে। আরও দুর্বার হয়ে ওঠে ওর আকর্ষণ, মানুষ বড় বেশি সচেতন হয়ে উঠে নিজের সম্বন্ধে ওর দিকে চেয়ে। এই কাঁচা মাংসের পাকা শিল্পকলা যেন গ্রাস করতে চায় মানুষের মন বুদ্ধি আর হিতাহিত জ্ঞানকে। (পৃ:৭৭)

গোসাঁইর মুখে উপন্যাসের শুরুর দিকের কথাঃ
কাটোয়া ছাড়িয়ে গঙ্গার উজানে উঠতে থাকলে আসবে উদ্ধারণপুর। শ্রীশ্রীচৈতন্যদেবের পার্ষদ শ্রীউদ্ধারণ দত্ত ঠাকুর*। তাঁরই নামের স্মৃতি বহন করছে উদ্ধারণপুর। কিন্তু সে কথা কারও মনে পড়ে না। উদ্ধারণপুর বলতে বোঝায় উদ্ধারণপুরের ঘাট। ‘যত মরা উদ্ধারণপুরের ঘাটে’—এটা হচ্ছে ওদেশের একটা চলতি কথা। অবাঞ্ছিত কেউ এসে জ্বালাতে থাকলে বিরক্তি প্রকাশ করে এই কথাটা যখন তখন বলা হয়। (পৃ:১৩)

* শ্রীউদ্ধারণ দত্ত ঠাকুর।
‘কথিত আছে, নৈহাটির নৈরাজা নামে এক রাজার দেওয়ান ছিলেন উদ্ধারণ দত্ত। পরে হুগলির সপ্তগ্রামের এই বাসিন্দা সমস্ত ঐশ্বর্য ছেড়ে শ্রীচৈতন্যের অন্যতম পার্ষদ নিত্যানন্দের সঙ্গী হন। নিত্যানন্দের নির্দেশ মতোই কাটোয়া থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে ভাগীরথী তীরে এক জায়গায় আশ্রম গড়ে তোলেন তিনি। সেখান থেকেই শ্রীচৈতন্যের ভাবধারা প্রচার করতে শুরু করেন।’ —আনন্দবাজার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৫, বৈষ্ণব সাধকের স্মৃতিতে আজও মজে উদ্ধারণপুর।

Comments